ইসলাম বিদ্বেষী সাহিত্যের অগ্রদূত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উগ্র সাম্প্রদায়িকতায় রবীন্দ্রনাথ ছিলো শীর্ষে, সে শুধু
নিজেই মুসলিম বিদ্বেষী ছিলো না, উপরন্তু কথিত সাহিত্য
চর্চার মাধ্যমে সে হিন্দুদের চরমশ্রেণীর মুসলিম
বিদ্বেষী হতে সাহায্য করতো। তাই বিংশ শতাব্দীর শুরু
দিকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পেছনে এই রবীন্দ্রনাথের
কৃতিত্ব কম নয়।
রবীন্দ্রনাথের এই অতি সাম্প্রদায়িকতার দলিল তার রচনার
রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। আসুন রবীন্দ্রনাথের ইসলাম
বিদ্বেষী সাহিত্যের কিছু নমুনা দেখি:
(১)
রবীন্দ্রনাথ তার ‘রীতিমত নভেল’ নামক ছোটগল্পে
মুসলিম চরিত্র হরণ করেছে এভাবে-
“আল্লাহো আকবর শব্দে বনভূমি প্রতিধ্বনিত হয়ে
উঠেছে।
একদিকে তিন লক্ষ যবন (অসভ্য) সেনা অন্য দিকে তিন সহস্র
আর্য সৈন্য।
… পাঠক, বলিতে পার …
কাহার বজ্রমন্ডিত ‘হর হর বোম বোম’ শব্দে
তিন লক্ষ ম্লেচ্ছ (অপবিত্র) কণ্ঠের ‘আল্লাহো আকবর’
ধ্বনি
নিমগ্ন হয়ে গেলো।
ইনিই সেই ললিতসিংহ।
কাঞ্চীর সেনাপতি।
ভারত-ইতিহাসের ধ্রুব নক্ষত্র।”
(২)
রবীন্দ্রনাথ তার ‘সমস্যা’ ‘পুরান’, ‘দুরাশা’ ও ‘কাবুলীওয়ালা’
গল্পে মুসলমানদের জারজ, চোর, খুনি ও অবৈধ প্রণয়
আকাঙ্খিণী হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
বিশেষ করে ‘দুরাশা’ গল্পের কাহিনীটি আরো স্পর্শকাতর।
এখানে দেখানো হয়েছে, একজন মুসলিম নারীর হিন্দু
ধর্ম তথা ব্রাহ্মণদের প্রতি কি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং এই মুসলিম
নারীর ব্রাহ্মণ হবার প্রাণান্তকর কোশেশের চিত্র।
(৩)
রবীন্দ্রনাথ এমন এক ব্যক্তি যে ভারতবর্ষব্যাপী শুধুমাত্র
হিন্দুদের নিয়ে একক ও ঐক্যবদ্ধ হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার
আকাঙ্খা পোষণ করতো। মহারাষ্ট্রের ‘বালগঙ্গাধর তিলক’
১৮৯৫ সালের ১৫ এপ্রিল ‘শিবাজী উৎসব’ প্রতিষ্ঠা করেছিল
উগ্র হিন্দু জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রচার ও প্রসারের জন্য।
‘সঞ্চয়িতা’ কাব্যগ্রন্থে ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ
এ আকাঙ্খা করে বলে-
“এক ধর্ম কাব্য খ-ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে দিব আমি …….
…….. ‘এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে’ এ মহাবচন করিব
সম্বল।”
‘শিবাজী-উৎসব’ নামক কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আরো বলেছে
শিবাজী চেয়েছে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারতজুড়ে এক
ধর্ম রাজ্যের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাঙালিরা সেটা বোঝেনি। না
বুঝে করেছে ভুল।
(৪)
মুসলমান সমাজের প্রতি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়
পাওয়া যায় ‘কণ্ঠরোধ’ (ভারতী, বৈশাখ-১৩০৫) নামক প্রবন্ধে।
সিডিশন বিল পাস হওয়ার পূর্বদিনে কলকাতা টাউন হলে এই
প্রবন্ধটি সে পাঠ করে। এই প্রবন্ধে উগ্র
সাম্প্রদায়িকতাবাদী রবীন্দ্রনাথ একটি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত দিতে
গিয়ে বলে-
“কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান
কলিকাতার রাজপথে লোষ্ট্রন্ড হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা
করিয়াছিল। তাহার মধ্যে বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে- উপদ্রবের
লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজদেরই প্রতি। তাহাদের শাস্তিও
যথেষ্ট হইয়াছিল। প্রবাদ আছে- ইটটি মারিলেই পাটকেলটি
খাইতে হয়; কিন্তু মূঢ়গণ (মুসলমান) ইটটি মারিয়া পাটকেলের
অপেক্ষা অনেক শক্ত শক্ত জিনিস খাইয়াছিল। অপরাধ করিল, দ-
পাইল; কিন্তু ব্যাপারটি কি আজ পর্যন্ত স্পষ্ট বুঝা গেল না।
এই নিম্নশ্রেণীর মুসলমানগণ সংবাদপত্র পড়েও না,
সংবাদপত্রে লেখেও না। একটা ছোট বড়ো কা- হইয়া গেল
অথচ এই মূঢ় (মুসলমান) নির্বাক প্রজা সম্প্রদায়ের মনের কথা
কিছুই বোঝা গেল না। ব্যাপারটি রহস্যাবৃত রহিল বলিয়াই সাধারণের
নিকট তাহার একটা অযথা এবং কৃত্রিম গৌরব জন্মিল। কৌতুহলী কল্পনা
হ্যারিসন রোডের প্রান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া তুরস্কের
অর্ধচন্দ্র শিখরী রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত সম্ভব ও অসম্ভব
অনুমানকে শাখা পল্লবায়িত করিয়া চলিল।
ব্যাপারটি রহস্যাবৃত রহিল বলিয়াই আতঙ্কচকিত ইংরেজি কাগজ কেহ
বলিল, ইহা কংগ্রেসের সহিত যোগবদ্ধ রাষ্ট্র বিপ্লবের সূচনা;
কেহ বলিল মুসলমানদের বস্তিগুলো একেবারে উড়াইয়া
পুড়াইয়া দেয়া যাক, কেহ বলিল এমন নিদারুণ বিপৎপাতের সময়
তুহিনাবৃত শৈলশিখরের উপর বড়লাট সাহেবের এতটা সুশীতল
হইয়া বসিয়া থাকা উচিত হয় না।”
এই প্রবন্ধে উল্লিখিত বক্তব্যের পাশাপাশি শব্দ প্রয়োগ
লক্ষ্য করলে মুসলমান সমাজের প্রতি উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদী
রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির একটা সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়।
এখানে বলা প্রয়োজন যে, রবীন্দ্রনাথের পরিবারের
জমিদারী ছিল পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়া, শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর,
রাজশাহী প্রভৃতি অঞ্চলে। আর এইসব অঞ্চল ছিল মুসলমান
প্রধান। এই উন্মাসিক মানসিকতা ও বক্তব্য তার জমিদারীতে বিপুল
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলমানদের প্রতি উগ্র
সাম্প্রদায়িকতাবাদী রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির একটা উজ্জ্বল
উদাহরণ।
(৫)
‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকে প্রতাপাদিত্যের উক্তি- খুন করাটা যেখানে
ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম
নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের মুসলিম বিদ্বেষ
এবং বিরোধিতার অবস্থান চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়।
এখানেও সে সাম্প্রদায়িক ভূমিকায় অবতীর্ণ। তার নাটকের এই
বক্তব্য হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায় এবং হিন্দু-
মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভূমি তৈরি করে দেয়। তাই
ঐতিহাসিকভাবে বলা হয়- বিশ শতকের প্রথম দশক থেকে শুরু
হওয়া হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার দায়ভার রবীন্দ্রনাথ কোনো
ক্রমেই এড়াতে পারে না।
(৬)
রবীন্দ্রনাথের উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদীর অন্যতম দলিল তার
শিবাজী উৎসব কবিতা ।
এই কবিতা এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের অনুষঙ্গে
রবীন্দ্রনাথের মুসলিম বিরোধিতার অবস্থানটি চূড়ান্ত পর্যায়ে
উপনীত হয়।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারতের ইতিহাসে
বিশেষত মুঘল ভারতের ইতিহাসে হিন্দুত্ববাদী শিবাজী
একজন ধূর্ত, শঠ, বিশ্বাস ভঙ্গকারী, চতুর সন্ত্রাসী মারাঠা
আঞ্চলিক নেতা হিসাবে কুখ্যাত। তার সন্ত্রাসী কর্মকা-
পরিচালিত হয়েছিল ন্যায়পরায়ণ মুঘল স¤্রাট আওরঙ্গজেব
বিরুদ্ধে।
উনিশ শতকের বাংলা পুনরুত্থানপন্থীরা শিবাজীকে ভারতের
বীর হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে। এমনকি আঠারো
শতকের বাংলার জনজীবন মারাঠা দস্যুদের পুনঃপুনঃ আক্রমণে
বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
তাদের লুটপাট, হত্যা, রাহাজানি, আর আক্রমণের কবল থেকে
বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যাকে রক্ষার জন্য নবাব আলীবর্দী খান
প্রাণপণ লড়াই করেছিলেন। হিন্দুত্ববাদী মারাঠারা এই
অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো। বাংলার
পশ্চিমাঞ্চল, বিহার ও উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিরাণভুমিতে
পরিণত করেছিল মারাঠারা।
বাংলায় মারাঠা বর্গীদের এই হামলার প্রামাণ্য চিত্র উপস্থাপন
করেছে কবি গঙ্গারাম। তার লেখা পুঁথির নাম ‘মহারাষ্ট্র পূরাণ’।
পুঁথিটি ঘটনার সমসাময়িককালে অর্থাৎ ১৭৫১ সালে রচিত। এই পুঁথিটি
আবিষ্কৃত হয়েছে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলা থেকে।
ঐতিহাসিক প্রামাণ্য তথ্যে এটা স্বীকৃত যে পলাশী
পূর্ববর্তী সুবে বাংলার অর্থাৎ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার জনজীবন
সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল হিন্দুত্ববাদী মারাঠা দস্যুদের
সন্ত্রাসী হামলা, লুণ্ঠন, হত্যা ও আক্রমণে।
নবাব আলীবর্দী খান মারাঠা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে
প্রতিরোধ যুদ্ধে তার শাসনামলের প্রায় পুরো সময়কালটি
ব্যাপৃত থাকেন।
উনিশ শতকের কথিত হিন্দু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী উল্টো
সন্ত্রাসী মারাঠাদের আক্রমণ, লুটপাট আর কর্মকা-কে মুসলিম
বিরোধী অভিহিত করে হিন্দুদের কথিত গৌরব হিসেবে
চিহ্নিত করতে থাকে। প্রধানত এই হিন্দু পুনরুত্থানবাদী
আন্দোলনের পটভূমিতে বাংলার হিন্দু সমাজ বিজাতীয়
মারাঠাদের গুণকীর্তন আর বন্দনা শুরু করে। উগ্র
সাম্প্রদায়িকতাবাদী রবীন্দ্রনাথ ছিলো এই ধারারই শক্তিশালী
প্রবক্তা।
রবীন্দ্রনাথকে তাই উগ্রহিন্দুত্ববাদী লুটেরা শিবাজীকে
হিরো রূপে পেশ করতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর
“শিবাজী উৎসব” কবিতায় শিবাজীর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে
লিখেছে,
“হে রাজ-তপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা
বিধর ভা-ারে
সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল কভু তার এক কণা
পারে হরিবারে?
তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশ-লক্ষ্মীর পূজাঘরে
সে সত্য সাধন,
কে জানিত, হয়ে গেছে চির যুগ-যুগান্তর ওরে
ভারতের ধন।”
ঐতিহাসিক ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে
লিখেছেঃ “হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে
বাসা বেঁধেছিল, যদিও স্বজ্ঞানে তাঁদের অনেকেই কখনই
এর উপস্থিতি স্বীকার করবে না। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে,
ভারতের রবীন্দ্রনাথ যাঁর পৃথিবীখ্যাত আন্তর্জাতিক
মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কিছুতেই সুসংগত
করা যায় না। তবুও বাস্তব সত্য এই যে, তার কবিতাসমূহ শুধুমাত্র
শিখ, রাজপুত ও মারাঠাকুলের বীরবৃন্দের গৌরব ও মাহাত্ম্যেই
অনুপ্রাণিত হয়েছে, কোনও মুসলিম বীরের মহিমা
কীর্তনে তিনি কখনও একচ্ছত্রও লেখেননি। যদিও তাদের
অসংখ্যই ভারতে আবির্ভূত হয়েছেন। এ থেকেএ প্রমাণিত
হয় উনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তা জ্ঞানের উৎসমূল কোথায়
ছিল।” (সূত্রঃ Dr. Romesh Chandra Majumder, History of
Bengal, p 203.)
(৭)
ভারতে সতিদাহ প্রথাকে আইন করে বিলুপ্ত করে ব্রিটিশ
সরকার। বিধবা হিন্দু রমনীদের বাঁচানো নিয়ে কবিতা বা প্রবন্ধ
না লিখলেও রবীন্দ্রনাথের নজর পরে তাদের গো’
দেবতা বাঁচানোর দিকে। তখন সে গো’ দেবতা বাঁচানোর
মিশন নিয়ে ময়দানে নামে শিবাজীর অন্ধভক্ত মহারাষ্ট্রের
সাম্প্রদায়িক নেতা ‘বালগঙ্গাধর তিলক’। সে ১৮৯৩ সালে
প্রতিষ্ঠা করে “গোরক্ষিণী সভা”। গরু বাঁচাতে গিয়ে তখন
ভারত জুড়ে শুরু হয় মুসলিম হত্যা। রবীন্দ্রনাথ, তিলকের এ
মিশনে একাত্ম হয় এবং তার জমিদারী এলাকায় গরু কোরবানী
নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই হল, হিন্দু বাঙালী রবীন্দ্রনাথের
রেনেসাঁ চেতনা।
ঐতিহাসিক নীরদ চৌধুরী তাই লিখেছে, “রামমোহন থেকে
রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছে
একটি মাত্র সমন্বয় সাধনের, আর সে সমন্বয়টি হিন্দু ও
ইউরোপীয় চিন্তাধারার। ইসলামী ভাবধারা ও ট্রাডিশন তাঁদের
চেতনাবৃত্তকে কখনও স্পর্শ করেনি। -(সূত্র, Nirod
Chandra Chowdhury, Autobiography of an Unknown
Indian, p 196.)
(৮)
রবীন্দ্র-সাহিত্যের মধ্যে যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দু
মানস সেটি মুসলমানদের কাছে স্বভাবতই গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু সেটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য পরিকল্পিতভাবে
সুগারকোট লাগানো হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে এই বলে
যে রবীন্দ্রনাথ ছিলো অসাম্প্রদায়িক। বলা হচ্ছে সে উভয়
বাংলার কবি, সে বিশ্বকবি ইত্যাদি বহুকিছু।
প্রশ্ন হল, রবীন্দ্রনাথ যে জন্মভূমির স্বপ্ন দেখতো বা
কথা বলতো সেটি কি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের? যে চেতনা ও
যে ধর্মবিশ্বাসের কথা বলতো সেটিও কি উভয়ের?
অস্পৃশ্য রবীন্দ্রনাথ তার ‘জন্মভূমি’ প্রবন্ধে যে জন্মভূমির
কথা আলোচনা করেছে সেখানে আছে মায়ের পূজা,
মায়ের প্রতিষ্ঠা, আছে অধিষ্ঠাত্রী দেবী ও ভারতীয়
ভারতীয় বীণাধ্বনি। সে যে মনে প্রাণে মূর্তিপূজারী হিন্দু
ছিলো তার পরিচয় রেখেছে তার পূজারিনী কবিতায়।
সেখানে লিখেছে,
“বেদব্রাহ্মণ-রাজা ছাড়া আর কিছু
কিছু নাই ভবে পূজা করিবার।”
(৯)
তার ‘বৌ ঠাকুরানীর হাট’ উপন্যাসে সে প্রতাব চরিত্রের মুখ
দিয়ে ম্লেচ্ছদের (অপবিত্র মুসলমানদের) দূর করে আর্য
ধর্মকে রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত করার সংকল্প করে।
‘গোরা’ উপন্যাসে গোরার মুখ দিয়ে ইসলাম বিরোধী
জঘন্য উক্তি করিয়েছে। ‘সমস্যাপূরণ’ গল্পে অছিমদ্দিনকে
হিন্দু জমিদারের জারজ সন্তান বানিয়েছে।
রবীন্দ্র-মানস বা রবীন্দ্র চেতনা কতটুকু মুসলিম বিদ্বেষী
ছিলো সে রবীন্দ্র-চেতনার পরিচয় তুলে ধরেছে আবুল
মনসুর আহমদ। সে লিখেছে, “হাজার বছর মুসলমানরা হিন্দুর
সাথে একদেশে একত্রে বাস করিয়াছে। হিন্দুদের রাজা
হিসেবেও, প্রজা হিসেবেও। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই
হিন্দু-মুসলমানে সামাজিক ঐক্য হয় নাই। হয় নাই এই জন্য যে,
হিন্দুরা চাহিত ‘আর্য-অনার্য, শক, হুন’ যেভাবে ‘মহাভারতের
সাগর তীরে’ লীন হইয়াছিল মুসলমানেরাও তেমনি মহান হিন্দু
সমাজে লীন হইয়া যাউক। তাদের শুধু ভারতীয় মুসলমান
থাকিলে চলিবে না, হিন্দু মুসলমান’ হইতে হইবে। এটা শুধু
কংগ্রেসী বা হিন্দু সভার জনতার মত ছিল না, বিশ্বকবি
রবীন্দ্রনাথের মত ছিল। -(সূত্র: আবুল মনসুর আহমদ, আমার
দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১৫৮-১৫৯।
(১০)
‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’ (রচনাকাল বাংলা ১৩০০ সাল) এবং ‘সুবিচারের
অধিকার’ (রচনাকাল বাংলা ১৩০১ সাল) নামক প্রবন্ধ দুটিতে
রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলিম সমস্যা নিয়ে আলোকপাত
করেছে। এখানেও মুসলিম বিরোধী অবস্থান থেকে
সরে আসেনি রবীন্দ্রনাথ। সুবিচারের অধিকার (রচনাকাল বাংলা
১৩০১ সাল) প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ইংরাজ সরকারকে
মুসলমানদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের জন্য অভিযোগ করে
বলে:
অনেক হিন্দুর বিশ্বাস, বিরোধ মিটাইয়া দেয়া গভর্মেন্টের
আন্তরিক অভিপ্রায় নহে। পাচ্ছে কংগ্রেস প্রভৃতির চেষ্টায়
হিন্দু মুসলমানগণ ক্রমশ ঐক্যপথে অগ্রসর হয় এই জন্য তারা
উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মবিদ্বেষ জাগাইয়া রাখতে চায় এবং
মুসলমানদের দ্বারা হিন্দুরা দর্প পূর্ণ করিয়া মুসলমানকে সন্তুষ্ট
ও হিন্দুকে অভিভূত করিতে ইচ্ছা করে। সর্বদাই দেখতে পাই
দুই পক্ষে যখন বিরোধ ঘটে এবং শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা
উপস্থিত হয় তখন ম্যাজিস্ট্রেট সূক্ষ্মবিচারের দিকে না গিয়ে
উভয়পক্ষকেই সমানভাবে দমন করিয়া রাখিতে চেষ্টা করে।
কারণ সাধারণ নিয়ম এই যে এক হাতে শব্দ হয় না।
কিন্তু হিন্দু-মুসলমান বিরোধে সাধারণের বিশ্বাস দৃঢ়বদ্ধমূল
হইয়াছে যে দমনটা অধিকাংশ হিন্দুর উপর দিয়া চলিতেছে এবং
প্রশ্রয়টা অধিকাংশ মুসলমানেরাই লাভ করিতেছে। এরূপ বিশ্বাস
জন্মিয়া যাওয়াতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঈর্ষানল আরো
অধিক করিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছে এবং যেখানে
কোনোকালে বিরোধ ঘটে নাই সেখানেও কর্তৃপক্ষ
আগেভাগে অমূলক আশঙ্কার অবতারণা করিয়া একপক্ষের
চিরাগত অধিকার কাড়িয়া লওয়াতে অন্যপক্ষের সাহস ও স্পর্ধা
বাড়িতেছে এবং চির বিরোধের বীজ বপন করা হইতেছে।
কেবল রাগাদ্বেষের দ্বারা পক্ষপাত এবং অবিচার ঘটিতে পারে
তাহা নহে, ভয়েতে করিয়াও ন্যায়পরায়ণতার নিক্তির কাঁটা
অনেকটা পরিমাণে কম্পিত বিচলিত হইয়া উঠে। আমাদের এমন
সন্দেহ হয় যে ইংরাজ মুসলমানকে মনে মনে কিছু ভয় করিয়া
থাকেন। এই জন্য রাজদন্ডটা মুসলমানের পা ঘেঁষিয়া ঠিক হিন্দুর
মাথার উপরে কিছু জোরের সহিত পড়িতেছে।”
যদিও মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের মনোভাব সবসময়ই
ছিলো বৈষম্যমূলক ও দমন-নিপীড়নের উপর নির্ভরশীল
তারপরও ঊনিশ শতকের শেষ দশকে দাঁড়িয়ে লেখা
রবীন্দ্রনাথের এই প্রবন্ধে দেখা যায় মুসলিম সমাজের
প্রতি ইংরেজদের কথিত সমানাধিকার প্রদান বা কথিত ন্যায় বিচার
করাও রবীন্দ্রনাথের বরদাশতের বাইরে ছিলো । এ
প্রবন্ধে তার বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির একটি স্পষ্ট অবস্থান
লক্ষ্য করা যায়। অথচ এটা অবশ্যই স্মরণীয় যে ঊনিশ
শতকের হিন্দু জমিদার, মহাজন, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সকলেই
ছিল ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের পদলেহী দালাল।
(১১)
সারা ঊনিশ শতকে ব্রিটিশরা সহায়তা করেছে বাংলার হিন্দু
সমাজকে। তবে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে নওয়াব
আবদুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩), সৈয়দ আমীর আলী
(১৮৪৯-১৯২৮) প্রমুখরা বাঙালি মুসলমান সমাজকে ব্রিটিশদের
সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্ঠা চালায়।
বাঙালি মুসলমান সমাজের সাথে ব্রিটিশ শক্তির গড়ে উঠা এই
সম্পর্ককে যবন রবীন্দ্রনাথ মেনে নিতে পারেনি। অথচ
রবীন্দ্রনাথের ‘ঠাকুর পরিবার’ ব্রিটিশ শক্তির প্রত্যক্ষ
প্রশ্রয়ে, আনুকূল্যে সাধারণ অবস্থা থেকে জমিদার
পরিবারে উন্নীত হয়। অন্যান্য হিন্দু জমিদারদের বেলায় একই
কথা প্রযোজ্য। বলা যায় হিন্দু জমিদার শ্রেণীর পুরোটাই
ছিল ব্রিটিশের দালাল। অথচ পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের প্রতি
ব্রিটিশদের কৌশলগত অনুকূল অবস্থান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ছিল
বিক্ষুব্ধ। এখানে সে একদিকে তার শ্রেণীগত
সীমাবদ্ধতা, স্বার্থের সংঘাত এবং অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক
মনোভাব দ্বারা পরিচালিত হয়েছে।
ঊনিশ শতকের শেষ দশকে লেখা পাঁচটি গল্পে
রবীন্দ্রনাথ মুসলিম প্রসঙ্গে অবতারণা করেছে। এগুলো
হলো ডালিয়া (১৮৯১), রীতিমত নভেল (১৮৯২), কাবুলিওয়ালা
(১৮৯২), সমস্যা পূরণ (১৮৯৩) এবং ক্ষুধিত পাষাণ (১৮৯৫)।
(১২)
বাংলা ১৩০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ মুসলিম ইতিহাস সম্পর্কিত তিনটি
গ্রন্থ সমালোচনা করে। এই তিনটি গ্রন্থ হলো আবদুল করিম
বিএ রচিত ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্বের ইতিবৃত্ত (সমালোচনা
প্রকাশ ভারতীয়, শ্রাবণ-১৩০৫, নিখিল নাথ রায়ের মুর্শিদাবাদ
কাহিনী, (সমালোচনা প্রকাশ ভারতীয়, শ্রাবণ ১৩০৫), নিখিল নাথ
রায়ের মুর্শিদাবাদ কাহিনী (সমালোচনা প্রকাশ ভারতয়
শ্রাবণ-১৩০৫) অক্ষয়কুমার মৈত্রের লিখিত সিরাজদ্দৌলা
(সমালোচনা প্রকাশ ভারতীয়, জ্যৈষ্ঠ ১৩০৫ এবং (শ্রাবণ
১৩০৫)। হেমলতা দেবী প্রণীত গ্রন্থ ভারতবর্ষের ইতিহাস
রবীন্দ্রনাথ সমালোচনা করে বাংলা ১৩০৫ সালের ভারতীয়
পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায়।
এই গ্রন্থ সমালোচনার অনুষঙ্গে ভারতে মুসলিম ইতিহাস
সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির খানিকটা পরিচয় পাওয়া
যায়। লেখিকা হেমলতা রচিত গ্রন্থের বিষয়বস্তু সম্পর্কে
আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলে, যে মোঘল
রাজত্বের পূর্বে তিনশত বছরব্যাপী কালরাত্রে ভারত
সিংহাসনে দাস বংশ থেকে লোদী বংশ পর্যন্ত পাঠান
রাজন্যবর্গের যে রক্তবর্ণ উল্কা বৃষ্টি হয়েছে গ্রন্থে
তার একটা বিবরণ থাকলে ভাল হতো।
এখানে লক্ষণীয় বিষয়টি হলো ভারতবর্ষের ইতিহাসে
সুলতানী শাসনামলকে রবীন্দ্রনাথ ভারত ইতিহাসের কালো
অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে প্রয়াসী হয়েছে। ভারতীয়
ইতিহাসের সুলতানী যুগের সুদীর্ঘ তিন শতাব্দী
সময়কালকে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত রবীন্দ্রনাথের
এই প্রয়াস অনৈতিক, সাম্প্রদায়িক এবং মুসলিম বিদ্বেষপ্রসূত।
অথচ সুলতানী আমলে ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক
ক্ষেত্রে বহুল উন্নতি সাধিত হয়। এই সময়কালে ভারতে একটি
প্রাতিষ্ঠানিক শাসন কাঠামো গড়ে উঠে। শিক্ষা ও শিল্পকলায়
নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটে। বহির্বিশ্বের সাথে ভারতের
প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ভারতের
নিম্নবর্গের মানুষ ব্রাহ্মণদের সামাজিক অত্যাচার ও সাংস্কৃতিক
সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ভারতের নিম্নবর্গের মানুষ ব্রাহ্মণদের
সামাজিক অত্যাচার থেকে রেহাই পায়।
এ ধরনের উদাহরণ দিলে স্ট্যাটাস আরো বড় হয়ে যাবে।
তাই মূল কথা হচ্ছে, এ ধরনের একটি মুসলিম বিদ্বেষী
লেখকের রচনা কখনও সাধারণ মুসলমানদের পক্ষে
বরদাশতযোগ্য নয়।।