জুম্মার খুতবা প্রসংগে

আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় জুম্মার খুতবা দেয়া বিদাত

আচ্ছালামু আলইকুম ,
প্রশ্ন:—- আমাদের দেশে সচরাচর আরবীতেই খুৎবা দিয়ে থাকেন , আবার
ইদানীং কোথাও কোথাও শুধু বাংলাতেই খুৎবার প্রচলন দেখা যাচ্ছে,
বর্তমানে অনেক দেশ যেখানে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ও অন্যান্য
ভাষার লোকজন ও আছে সেখানে , বাংলা আরবী ইংরেজী ইত্যাদীর
সংমিশ্রনে খোৎবা দিয়ে থাকেন । এমনটি জায়েয কিনা ?আর আমাদের
দেশে আরবীর সংমিশ্রনে বাংলাতে খোৎবা দেয়া যাবে কি ?
এম এম আবদুল্লাহ ভূঁইয়া
মক্কা সৌদি আরব
উত্তর
ﻭﻋﻠﻴﻜﻢ ﺍﻟﺴﻼﻡ ﻭﺭﺣﻨﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺑﺮﻛﺎﺗﻪ
ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺍﻟﺮﺣﻴﻢ
জুমআর খুতবা অন্য কোন ভাষায় প্রদান করা বিদআত। আরবী ছাড়া অন্য কোন
ভাষায় খুতবা প্রদান করা রাসূল সাঃ এবং পরবর্তীতে কোন সাহাবী থেকেই
প্রমাণিত নয়।
নবীজী সাঃ এর মৃত্যুকালের শেষ সময়ে আরবের বাহিরের অনেক
অনারবী মুসলমানই মসজিদে নববীতে এসে নামায পড়তো। কিন্তু
কোনদিনও কোন জুমআর খুতবা অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়নি।
সাহাবায়ে কেরামের জমানায় এর কোন নজীর পাওয়া যায় না। হযরত উমর রাঃ এর
জমানায় অনারবী মানুষে ভরে গিয়েছিল মদীনা। কিন্তু কোনদিন মসজিদে
নববীতে জুমআর খুতবা আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় দেয়া হয়েছে বা
দোভাষী দিয়ে অন্য ভাষায় তা অনুবাদ করা হয়েছে এর কোন নজীর
নেই।
সেই সাথে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন দেশে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে
গেছেন। সেসব রাষ্ট্রে ইসলামের আলো ছড়িয়েছেন। কিন্তু অনারবী
রাষ্ট্রে এসে আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দিয়েছেন বা তাদের আরবী
খুতবা অন্য ভাষায় অনুবাদ করে জুমআর সময় শুনানো হয়েছে এর কোন
নজীর নেই।
যে কাজ রাসূল সাঃ করেননি, বা পরবর্তী সাহাবায়ে কেরাম করেননি। সে কাজ
দ্বীন হিসেবে করা সুনিশ্চিতভাবেই বিদআত। এতে কোন সন্দেহ নেই।
তাই জুমআর খুতবা আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় প্রদান করা বিদআত। এটি
পরিত্যাজ্য।
নামাযের কিরাত যেমন আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় পড়া বিদআত। ঠিক তেমনি
জুমআর খুতবা আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় দেয়া বিদআত।
যারা এ বিদআতি কাজটি করে যাচ্ছেন, তাদের কাছে এ বিষয়ে রাসুল সাঃ থেকে
এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে সহীহ হাদীসের দলীল চান। তাহলেই
দেখবেন, দলীল নয় মনের খাহেশাতই হচ্ছে তাদের দলীল।
সুতরাং এ বিদআতি কাজ থেকে সকলেরই বিরত থাকতে হবে।
হযরত ইরবাস বিন সারিয়া রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন,
ﻣَﻦْ ﻳَﻌِﺶْ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻳَﺮَﻯ ﺑَﻌْﺪِﻱ ﺍﺧْﺘِﻠَﺎﻓًﺎ ﻛَﺜِﻴﺮًﺍ، ﻓَﻌَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺑِﺴُﻨَّﺘِﻲ ﻭَﺳُﻨَّﺔِ ﺍﻟْﺨُﻠَﻔَﺎﺀِ ﺍﻟﺮَّﺍﺷِﺪِﻳﻦَ
ﺍﻟْﻤَﻬْﺪِﻳِّﻴﻦَ، ﻭَﻋَﻀُّﻮﺍ ﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ ﺑِﺎﻟﻨَّﻮَﺍﺟِﺬِ، ﻭَﺇِﻳَّﺎﻛُﻢْ ﻭَﻣُﺤْﺪَﺛَﺎﺕِ ﺍﻟْﺄُﻣُﻮﺭِ، ﻓَﺈِﻥَّ ﻛُﻞَّ ﻣُﺤْﺪَﺛَﺔٍ ﺑِﺪْﻋَﺔٌ،
ﻭَﺇِﻥَّ ﻛُﻞَّ ﺑِﺪْﻋَﺔٍ ﺿَﻠَﺎﻟَﺔٌ
তোমাদের মাঝে আমার পর জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতভেদ
দেখবে। তখন তোমাদের উপর আমার এবং আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে
রাশেদীনের সুন্নত আঁকড়ে ধরবে। সেটিকে মাড়ির দাত দিয়ে কামড়ে
রাখবে। আর সাবধান থাকবে নব উদ্ভাবিত ধর্মীয় বিষয় থেকে। কেননা ধর্ম
বিষয়ে প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী। {মুসনাদে
আহমাদ, হাদীস নং-১৭১৪৪}
ﻋَﻦْ ﻋَﺎﺋِﺸَﺔَ، ﻗَﺎﻟَﺖْ: ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ: ‏« ﻣَﻦْ ﺃَﺣْﺪَﺙَ ﻓِﻲ ﺃَﻣْﺮِﻧَﺎ ﻫَﺬَﺍ
ﻣَﺎ ﻟَﻴْﺲَ ﻣِﻨْﻪُ ﻓَﻬُﻮَ ﺭَﺩٌّ »
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি
আমাদের ধর্মে নেই এমন বিষয় ধর্মীয় বিষয় বলে আবিস্কার করে তা
পরিত্যাজ্য। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৭১৮, বুখারী, হাদীস নং-২৬৯৭}
একটি মনগড়া কিয়াসের জবাব
যারা রাসূল সাঃ ও সাহাবায়ে কেরামের পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে নিজের নফসের পূজা
করে আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দিয়ে থাকেন, তারা কুরআন ও হাদীস
রেখে নিজের অজ্ঞ মস্তিস্কপ্রসূত একটি ভ্রান্ত কিয়াসের আশ্রয় নিয়ে
থাকেন। সেটি হল, তারা বলেন, খুতবা হল একটি বক্তৃতা। আর বক্তৃতা সেই
ভাষায়ই দিতে হবে, যে ভাষায় মানুষ বুঝে থাকে।
জবাব

খুতবা মানে শুধু বক্তৃতা এটি অজ্ঞতাসূচক বক্তব্য। কুরআন ও হাদীসে জুমআর
খুতবাকে শুধু বক্তৃতা সাব্যস্ত করা হয়নি।
কুরআনে খুতবাকে জিকির বলা হয়েছে-
ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺇِﺫَﺍ ﻧُﻮﺩِﻱَ ﻟِﻠﺼَّﻠَﺎﺓِ ﻣِﻦ ﻳَﻮْﻡِ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔِ ﻓَﺎﺳْﻌَﻮْﺍ ﺇِﻟَﻰٰ ﺫِﻛْﺮِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺫَﺭُﻭﺍ ﺍﻟْﺒَﻴْﻊَ
ﺫَٰﻟِﻜُﻢْ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَّﻜُﻢْ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢْ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ ‏[ ٦٢ : ٩ ]
মুমিনগণ, জুমআর দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর
স্মরণের পানে ত্বরা কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে
উত্তম যদি তোমরা বুঝ। ( সুরা জুমা আয়াত ৯ )
আই আয়াতের মধ্যকার যিকরুল্লাহ দ্বারা প্রায় সকল মুফাসসিরদের মতে খুতবা
উদ্দেশ্য । (তাফসিরে রাযি ১/৪৪৬, তাফসিরে রুহুল মাআনি ২৮/১০২, তাফসিরে
ইবনে আব্বাস রাঃ)
হাদিসেও খুতবাকে যিকির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ।
ﻓﺈﺫﺍ ﺧﺮﺝ ﺍﻹﻣﺎﻡ ﺣﻀﺮﺕ ﺍﻟﻤﻼﺋﻜﺔ ﻳﺴﺘﻤﻌﻮﻥ ﺍﻟﺬﻛﺮ
যখন ইমাম খুতবা দিতে বের হন তখন ফেরেশতারা এসে যিকির শুনে অর্থাৎ
খুতবা শোনে । (বোখারি ১/৩০১, মুসলিম হাদিস নং ৮০৫)
সুতরাং কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির যেমন অন্য ভাষায় দেয়া হয় না।তেমনি খুতবাও
অন্য ভাষায় দেয়ার বিধান নেই।

হাদীসে জুমার খুতবাকে দুই রাকাত নামজের স্থলাবিসিক্ত করা হয়েছে ।
হযরত ওমর ও আয়েশা রঃ থেকে বর্ণিত
ﺣَﺪِﻳﺚُ ﻋُﻤَﺮَ ﻭَﻏَﻴْﺮِﻩِ ﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺇﻧَّﻤَﺎ ﻗَﺼُﺮَﺕْ ﺍﻟﺼَّﻠَﺎﺓُ ﻟِﺄَﺟْﻞِ ﺍﻟْﺨُﻄْﺒَﺔِ জুমার নামাজ কে
খুতবার জন্য ছোট করে দেওয়া হয়েছে। (ইবনে হাজার আসকালানি তালখিসুল
হাবির ২/১৭৬)
ﻛَﺎﻧَﺖِ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔُ ﺃَﺭْﺑَﻌًﺎ ﻓَﺠُﻌِﻠَﺖِ ﺍﻟْﺨُﻄْﺒَﺔُ ﻣَﻜَﺎﻥَ ﺍﻟﺮَّﻛْﻌَﺘَﻴْﻦِ জুমার নামাজ চার রাকাত ছিল অতঃপর
খুতবাকে দুই রাকাতের স্থলাবিসিক্ত করা হয়েছে (বাইহাকি ৫২৫৮ নং)
শুধু নিছক বক্তৃতার নাম খুতবা নয়। এটি নামাযের মতই গুরুত্বপূর্ণ ও দুই রাকাতের
স্থলাভিসিক্ত। তাই নামাযে যেমন আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় পড়া যায় না,
তেমনি খুতবাও অন্য ভাষায় পড়া যাবে না।
খুতবা অন্য ভাষায় দেয়ার দাবি ইসলামকে খেলনা বস্তু বানানোর ষড়যন্ত্র
আজান, ইকামত, তাকবীর, কুরআন, তিলাওয়াত, জিকির ও খুতবা এ সবই ইসলামের
প্রতীক। এর কোনটিরই অন্য ভাষায় পড়ার কোন নজীর রাসূল সাঃ থেকে
নেই। নেই সাহাবায়ে কেরাম রাঃ থেকে। এমনকি তাবেয়ী বা তাবেয়ীগণ
থেকেও নেই।
তাই এসবকে অনুবাদ করে বলার দাবি করা ইসলামের প্রতিককে পাল্টে ফেলার
ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা
প্রদানকারী বিদআতি ব্যক্তিদের থেকে মুসলিম উম্মাহকে হিফাযত করুন।
আমীন।
ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺍﻋﻠﻢ ﺑﺎﻟﺼﻮﺍﺏ
(ধন্যবাদ- মুফতি লুৎফর রহমান ফরাজী)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s